অনেকে মনে করেন, একুশের বইমেলা হলো এক মাসের জন্য বই বিক্রির বড় একটা জায়গা। আসলে এই মেলা শুধু বই বিক্রির জন্য নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাষা শহীদদের স্মৃতির ব্যাপারও। এই এক মাস ধরে আমরা ভাষা শহীদদের যেমন স্মরণ করে থাকি, তেমনি বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রকাশিত হয় হাজার হাজার নতুন বই। লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের একটা বড় মিলনমেলাও বটে। দেশের অনেক মানুষের কাছে মেলাটা একটা আবেগের জায়গা তৈরি করেছে।
এই মেলাকে কীভাবে আন্তর্জাতিক বইমেলা করা যায়, তা নিয়ে অনেকের আগ্রহ দেখা যায়। কিন্তু আমি মনে করি, আমরা যে চেতনার জায়গা থেকে, আবেগ থেকে মেলাটা শুরু করেছি, সেটা আর থাকবে না। মেলায় নতুন বই দেখতে ও কিনতে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের অনেক জায়গা থেকে লোকজন এখানে আসেন। কারণ মেলাটা শুধু বাংলা ভাষাভাষী পাঠক, ক্রেতাদের জন্য আয়োজন করা হয়।
আন্তর্জাতিক বইমেলা করলে বিদেশি প্রকাশকদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের প্রকাশক আসবেন। মূল যে ভাবনা থেকে বইমেলা শুরু হয়েছিল, এর আবেদন তখন আর থাকবে না। তাই আন্তর্জাতিক মানের মেলা করা যেতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক মেলা করলে এর মূল আবেদন নষ্ট হবে।
এখন যা হচ্ছে সেটা ‘রুটিন ওয়ার্ক’ ছাড়া কিছু নয়। পরিকল্পনার অনেক অভাব। এ বছর মেলার পরিবেশ, অবকাঠামো সব মিলিয়ে গত বছরের চেয়েও অনেক খারাপ। এবার মেলার ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ থেকে শুরু করে সবকিছু নিজ দায়িত্বে করেছে বাংলা একাডেমি। এর আগে মেলার অবকাঠামো নির্মাণ করা হতো একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমে। ভেবেছিলাম জ্ঞানে, মননে ও সৃজনশীল মানুষেরাই যেহেতু বাংলা একাডেমিতে কাজ করেন, সেহেতু মেলায় নতুন কোনো চমক দেখা যাবে সব দিক থেকে। কিন্তু সেটা তো দূরের কথা, মেলার বেশির ভাগ সময় চলে যাওয়ার পরেও নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা রয়ে গেছে।
মেলা শুরুর এক সপ্তাহ পরেও স্টল তৈরি করতে দেখা গেছে। এসব আমি অভিযোগ আকারে বলছি না। কারণ বাংলা একাডেমি স্টল বরাদ্দের পর যদি অল্প সময় পান প্রকাশকেরা, তাহলে তো স্টল তৈরির যথেষ্ট সময় থাকে না। আর মেলা শুরুর এক সপ্তাহ পর নতুন স্টল তৈরি করাটা প্রশ্নের জন্ম দেয়। এবার মেলায় ইট বিছানো হয়নি। যথেষ্ট পানির ব্যবস্থা করা হয়নি। এই বইমেলা কিন্তু কয়েক বছর ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এটা আমাদের দেশের একটা পুরোনো মেলা। এখন পর্যন্ত আমরা নির্দিষ্ট নকশায় পৌঁছাতে পারিনি। স্টলগুলো এখানে-সেখানে ছড়িয়ে করা হয়েছে। অনেক প্রকাশক চরম ক্ষতির মধ্যে পড়ছেন। অনেক পাঠকেরও প্রিয় প্রকাশনী খুঁজে পেতে বেগ পেতে হচ্ছে।
মেলায় ঢোকা ও বের হওয়ার গেটের সংকট আছে। আমরা যদি কলকাতার বইমেলার দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাবে সেখানে অনেকগুলো গেট থাকে। সেখানে যেদিকে ইচ্ছে, সেদিক থেকে ঢুকতে ও বের হতে পারে। এখানে শুধু দুটি নির্দিষ্ট গেট আছে। অন্য একটি গেট থাকলেও কর্তৃপক্ষের প্রচারের অভাবে সেটি আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। দর্শনার্থী বা ক্রেতারা মেলায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হলে বিশ্রামের জন্য বসার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এত বড় একটা আয়োজনে এ ধরনের অব্যবস্থাপনা থাকা উচিত নয়। এতে মেলার আবেদন নষ্ট হয়। কিছু দোষ-ত্রুটি থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেটা বড় আকারের হলে সমস্যা। এ ধরনের অব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেয়া দরকার।
বাংলা একাডেমির কাজ আসলে গবেষণা করা। এ প্রতিষ্ঠানটি হলো আমাদের জ্ঞানের প্রতীক। প্রতিষ্ঠানটি বইমেলার পেছনে যে সময় ব্যয় করে, এতে তাদের মূল কাজটা বাধাগ্রস্ত হয়। সে কারণে বইমেলাটা প্রকাশকদের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত। প্রকাশকদের একটা বড় সংগঠন ‘বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক এবং বিক্রেতা সমিতি’। সেই সংগঠনের মাধ্যমে মেলা আয়োজন করা যেতে পারে। মূল কথা হলো, প্রকাশকদের মেলা তাদের হাতে ছেড়ে দিলেই মেলার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে।
আমরা মেলায় বই প্রদর্শন করতে চাই। প্রচুর লোকজন মেলায় এসে বই দেখুক। তারপর সারা বছর ধরে বই কেনার সুযোগ থাকে। যেমন ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশন পাঁচ বছর ধরে কাজ করে এ বছর অন্যতম কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের আট খণ্ডে রচনাবলী প্রকাশ করেছে। অনেকে মেলায় বই বিক্রি দিয়ে হিসাব করতে চায়, কিন্তু আমরা বিক্রি দিয়ে হিসাব করতে রাজি না।
কারণ মেলাটাকে প্রচারণার জায়গা হিসেবে দেখতে চাই। এই এক মাসের মেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মাধ্যম বইয়ের প্রচারণা করে থাকে, বই বছরের অন্য সময় প্রকাশ হলে হয়তো এভাবে পাঠকের নজরে আসত না। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ হলে গণমাধ্যম বা অন্য কোনোভাবে পাঠকের নজরে আসতে পারে। এ কারণে মেলায় কিনতে না পারলেও অন্য সময় কেনার সুযোগ থাকে। ফলে মেলায় লোক সমাগম একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যত বেশি বই লোকজন দেখতে পাবে, তত বেশি বইয়ের প্রচার হবে।
আর একটা বিষয়, স্টল বরাদ্দের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমিকে আরও কঠিন হতে হবে। কারণ এমন অনেক প্রকাশনী আছে, সারা বছর নাম শোনা যায় না। কিন্তু মেলায় এসব প্রতিষ্ঠানকে স্টল দেয়া হচ্ছে। যদি বাছাই করে মূল ধারার প্রকাশনীগুলোকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহলে মেলার সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পাবে।
একটা কথা শোনা যাচ্ছে, আগামী বছর থেকে মেলার স্থান পরিবর্তন করা হবে। অন্য কোথাও মেলাকে নিয়ে যাওয়া হবে। বাংলা একাডেমি, একুশের মাস, আর বইমেলা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলা একাডেমির বাইরে যদি মেলা চলে যায়, তাহলে তা নষ্ট হয়ে যাবে। এ সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী। মূল ধারার প্রকাশনীকে বাছাই করে ছোট পরিসরে হলেও নির্দিষ্ট স্থানেই মেলার আয়োজন করতে হবে। অন্য যেকোনো জায়গায় মেলা করা হলে, এটার আবেদন নষ্ট হয়ে যাবে।
লেখক : প্রকাশক, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশন
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

আবেগের জায়গা বইমেলা
- আপলোড সময় : ২৯-০২-২০২৪ ০৯:৫৩:৫৯ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৯-০২-২০২৪ ০৯:৫৩:৫৯ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ